গুরগাঁওয়ে মুসলিম পরিবারের উপর হামলা উগ্র হিন্দুত্ববাদীদের

bangla bangla news Bengali news National
রান্না করতে করতে বাইরে খুব কোলাহলের শব্দ শুনতে পাই। রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে দেখি একদল লোক আমাদের বাড়ির ভিতর ঢুকে পড়েছে। বাড়ির লোকজনকে মারছে। আমাদের দরজা-জানলা, গাড়ি সব ভেঙে দেয় ওরা’’, ভয়ে-আতঙ্কে কার্যত কথা আটকে যাচ্ছিল শামিনার। উগ্র হিন্দুত্ববাদীরা নির্বিচারে অত্যাচার চালিয়েছে তাঁদের উপর। চোখের সামনে স্বামীকে অজ্ঞান হয়ে যেতে দেখে, শিশু সন্তানকে ঠেলে ফেলে দিতে দেখে শামিনা বারবার হাতজোড় করে আরজি জানিয়েছেন। কিন্তু থামেনি তাণ্ডব। শামিনারা গুরগাঁওয়ের ধামাসপুর গ্রামের বাসিন্দা। ঘটনাটি বৃহস্পতিবার বিকাল পাঁচটা নাগাদ ঘটে।

গুরগাঁওয়ে মুসলিম পরিবারের উপর হামলা উগ্র হিন্দুত্ববাদীদের

 শনিবার তা প্রকাশ্যে আসে। হোলির দিন নিজেদের বাড়ির বাইরে ক্রিকেট খেলছিলেন শামিনার পরিবারের ছেলেরা। মুসলিম পরিবারের ছেলেরা রাস্তায় ক্রিকেট খেলছে, সেটাই ছিল তাঁদের ‘অপরাধ’! একদল উন্মত্ত হিন্দুত্ববাদী সেখানে এসে চিৎকার করতে শুরু করে, ‘‘পাকিস্তানে যা, ওখানে গিয়ে খেল।’’ তারপর শুরু হয় হামলা। প্রথমে রাস্তায়, তারপর একেবারে বাড়ির ভিতর ঢুকে। লাঠি, হকি স্টিক, লোহার রড— বাদ ছিল না কিছুই। স্বাভাবিকভাবেই বিজেপি সরকারের পুলিশ মানতে চায়নি এই তাণ্ডব চালিয়েছে উগ্র হিন্দুত্ববাদীরা। কিন্তু নিগৃহীতরা বারবারই অভিযোগ করেছেন, মদ্যপ অবস্থায় হিন্দুত্ববাদীরাই তাঁদের উপর এই নৃশংস অত্যাচার চালিয়েছে। আদপে উত্তর প্রদেশবাসী মহম্মদ সাজিদ তিন বছর ধরে হরিয়ানার ভূপ সিং নগরে থাকেন, সঙ্গে স্ত্রী শামিনা এবং ছয় সন্তান। হোলির দিন ছুটি থাকায় সাজিদের ভাইপোসহ আরও কয়েকজন আত্মীয় আসেন বাড়িতে। হঠাৎই ঠিক হয় সবাই মিলে হইহই করে ক্রিকেট খেলা হবে।

 সেইমতো রোদ পড়তে বিকালের দিকে বাড়ির বাইরে একটি ফাঁকা জায়গায় গিয়ে ক্রিকেট খেলতে শুরু করে তারা। সাজিদের ভাইপো দিলশাদের কথায়, ‘‘হঠাৎই বাইকে করে দু’জন লোক এসে আমাদের জিজ্ঞাসা করেন, এখানে কী হচ্ছে? তারপরই বলে, পাকিস্তানে গিয়ে খেল এসব।’’ প্রতিবাদ করেন সাজিদ। প্রতিবাদের স্বর চড়া হতেই বাইক চালক মারতে শুরু করে সাজিদকে। তার সঙ্গে থাকা আরেক দুষ্কৃতীও বাইক থেকে নেমে থাপ্পড় মারে সাজিদকে। সেইসঙ্গে হুমকি, ‘‘অপেক্ষা কর, কী হয় দেখ।’’ আকস্মিকতায় হতভম্ব হয়ে যান সাজিদরা। দিলশাদ জানান, ঠিক দশ মিনিট পরই দেখতে পাই দু’টো বাইকে করে ছ’জন এবং আরও অনেকজন হেঁটে এগিয়ে আসছে আমাদের দিকে। কারো হাতে বল্লম, কারো হাতে লাঠি, কারো হাতে তলোয়ার। ওদের দেখে আমরা বাড়িতে ঢুকে যাই। কিন্তু ওরা বাড়ির সামনে এসে শোরগোল শুরু করে। আমাদের বেরিয়ে আসার জন্য চাপ দিতে থাকে। এমনও বলে, ঘর থেকে না বেরোলে ওরা আমাদের মেরে ফেলবে। কিন্তু আমরা তা-ও বেরোইনি। তখন ওরা জোর করে আমাদের বাড়িতে ঢুকে মারধর শুরু করে। উগ্র হিন্দুত্ববাদীদের এই তাণ্ডব কিছুক্ষণ নিজের মোবাইলে ভিডিও করেন সাজিদের পরিবারের একজন। কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই তাঁর উপর চড়াও হয় ওই দুষ্কৃতীরা। এমনকী শিশুদেরও ঠেলে ফেলে দেয় তারা।

অল্প সময়ের ওই ভিডিও ফুটেজ ছড়িয়েও পড়েছে সোশ‌্যাল মিডিয়ায়। সেখানে দেখা গিয়েছে, উগ্র হিন্দুত্ববাদীরা কীভাবে তাণ্ডব চালিয়েছে। একজন মহিলা সামনে থাকলে, তাঁকেও তোয়াক্কা করেনি তাঁরা। যতক্ষণ সাজিদের জ্ঞান ছিল, ততক্ষণ তাকে বেধড়ক মেরেছে ওই দুষ্কৃতীরা। প্রথমে বাড়ির বাইরে থেকে পাথর ছুঁড়ে, তারপর বাড়ির ভিতর ঢুকে ভাঙচুরও চালিয়েছে। ভেঙে দেয় দরজা-জানলা-গাড়ি। শামিনা জানান, একজোড়া সোনার দুল, একটি সোনার চেন এবং সংসার চালানোর জন্য ঘরে রাখা ২৫ হাজার টাকা নিয়ে চম্পট দেয় তারা। অভিযোগ, পুলিশকে খবর দেওয়া হলেও তারা প্রায় চল্লিশ মিনিট পর ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। ততক্ষণে আক্রমণকারীরা পালিয়ে গিয়েছে। তারা কমপক্ষে চল্লিশজন থাকলেও মাত্র ছ’জনকে পুলিশ গ্রেপ্তার করতে পেরেছে বলে শনিবার রাত পর্যন্ত পাওয়া খবরে জানা গিয়েছে। ভিডিও দেখে বাকিদের চিহ্নিত করার চেষ্টা চলছে বলে দাবি পুলিশের। সাজিদ গ্যাস সিলিন্ডার মেরামত করেন, পুরানো আসবাবপত্র সারানোর কাজও করেন। একইসঙ্গে তিনি নির্মাণ শ্রমিকও। নিজের বাড়ি নিজের হাতেই তৈরি করেছেন।

সেই বাড়ি ছেড়ে অন্যত্র চলে যাওয়ার হুমকি দিয়ে গিয়েছে উগ্র হিন্দুত্ববাদীরা, নাহলে প্রাণে মেরে ফেলবে তারা। সাজিদের কোনও নিরাপত্তার ব্যবস্থা করেনি পুলিশ। গুরগাঁওয়ের এসিপি শামসির সিং নিজেই স্বীকার করেছেন, জলের পাইপ, হকি স্টিক, লোহার রড দিয়েও চলেছে মারধর। তারা যে সংখ্যায় চল্লিশের বেশি ছিল, তা-ও ধরা পড়েছে এসিপি’র কথায়। কিন্তু চল্লিশজনেরও বেশি লোক হামলা চালানোর পর মাত্র ১৫জনের বিরুদ্ধে এফআইআর রুজু করেছে পুলিশ। প্রাথমিকভাবে এফআইআর নিতেই চায়নি তারা, এমন অভিযোগও উঠেছে। গোটা বাড়িজুড়ে তাণ্ডব চালিয়ে সাজিদ-শামিনার জীবন নির্বাহের প্রায় সমস্ত কিছু ধ্বংস করে দিলেও এই ১৫জনের বিরুদ্ধে দায়ের হয়েছে পঞ্চাশ টাকার জিনিস নষ্টের অভিযোগ! সেইসঙ্গে ভীতি প্রদর্শন, অন্যায়ভাবে বাড়িতে ঢুকে যাওয়াসহ আরও কিছু অভিযোগ দায়ের হয়েছে। দেশজুড়ে আরএসএস-বিজেপি’র মদতে ঘটে চলা এইসব উন্মত্ততা রুখতে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কখনওই উপযুক্ত ব্যবস্থা নেয়নি সরকার। এই ঘটনাটি মনোহরলাল খাট্টারের সরকার ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা চালালেও সোশ‌্যাল মিডিয়ায় ভিডিও ছড়িয়ে পড়তেই তা প্রকাশ্যে চলে আসে। মাত্র পাঁচদিন আগে এই হরিয়ানারই আরেক গ্রামে বাবা-ছেলের উপর একইভাবে হামলা চালায় উগ্র হিন্দুত্ববাদীরা। মহম্মদ ইদ্রিস এবং তাঁর ছেলে মহসিনকে মারধর করে কোনও কারণ ছাড়াই। তাঁরাও এসেছিলেন উত্তর প্রদেশ থেকে, নিজেদের কাজে। সংবাদমাধ্যমের কাছে ইদ্রিস জানান, বাসস্ট্যান্ডে পৌঁছাতেই চার-পাঁচজন যুবক তাঁদের নাম জানতে চান।

 নাম বলতেই শুরু হয় মারধর। পরে বাধ্য করা হয় দাড়ি কেটে ফেলতে। দাড়ি দেখেই ওরা মনে করে, আমরা পাকিস্তানি সন্ত্রাসবাদী। তারপরই মারধর শুরু করে। আধার কার্ড দেখিয়ে প্রমাণও দিই যে আমরা ভারতীয়, কিন্তু কেউ কোনও কথা শোনেনি! সেদিনের ঘটনাতেও পুলিশ অভিযোগ দায়ের করে। কিন্তু কাউকে গ্রেপ্তার করার কোনও খবর নেই। ভিন্ন অজুহাতে বারবার উগ্র হিন্দুত্ববাদীরা মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষদের উপর হামলা চালাচ্ছে, খুন করছে। কিন্তু কোনও কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা মোদীর সরকার কখনওই করেনি। লোকসভা ভোটের আগে সাম্প্রদায়িক মেরুকরণের জিগির আরও বেশি করে তুলতে তাই সাজিদের পরিবারের উপর হামলার কোনও নিস্পত্তি হবে কি না, সেই সংশয় থেকেই যায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *